লোডশেডিং এর সময়টাকে যেভাবে কাজে লাগাতে পারেন

লোডশেডিং নিয়ে ত্যাক্ত বিরক্ত? কি করবেন বুঝতে পারছেন না! তবে আজকের লেখাটা আপনার জন্যই। আসুন জেনে নেই লোডশেডিং এর সময় যেসব উপায়ে আপনি নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন।

এখন সারা দেশেই লোডশেডিং এর জোয়ার চলছে। মূলত বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা এবং মূল্য বৃদ্ধির কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছে তার থেকেই এই লোডশেডিং এর উৎপত্তি। আমাদের যাদের জন্ম নব্বইয়ের দশকে তারা এই জিনিসটার সাথে খুব পরিচিত হলেও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এমন লোডশেডিং একটি বিস্ময়কর বস্তুই বটে!

আমার মনে আছে, যখন আমরা স্কুলে ক্লাস ফোর বা ফাইভে পড়ি, তখন প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়া ছিল খুব সাধারণ একটি ব্যাপার। আর ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলেই আমাদের আর পায় কে! ইতিউতি করে আস্তে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়তাম পাড়ার সবাই। এরপর দলবেঁধে লুকোচুরি খেলা চলতেই থাকত যতক্ষণ ইলেক্ট্রিসিটি পুনরায় ফেরত না আসত।

এখনকার লোডশেডিং দেখে আমরা নস্টালজিক হয়ে যাই বটে, তবে আগের সেই লুকোচুরি খেলার আমেজটা আর পাওয়া যায় না। কারণ বাস্তবতা আমাদের আজ এমন এক জায়গায় এনে দাড় করিয়েছে যে আমাদের জীবনটাই এখন পুরোপুরি হয়ে পড়েছে ইলেক্ট্রিসিটি নির্ভর। তাইতো মাত্র কয়েক মিনিট ইলেক্ট্রিসিটি না থাকলেই আমরা অতিষ্ঠ হয়ে যাই। আর এখন তো ইলেক্ট্রিসিটি এলাকাভেদে সব মিলিয়ে প্রায় ৭/৮ ঘণ্টা থাকছে না।

বিদ্যুৎ বিভাগের তরফ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং নিজেদের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে অন্তত এটুকু আমরা বুঝতেই পারছি যে এই লোডশেডিং এর সমস্যা খুব শিগগিরই শেষ হবার নয়। তাই লোডশেডিং এর প্রতি বিরক্ত না হয়ে বরং আমাদের উচিৎ অন্তত কয়েকমাসের জন্য এর সাথে জীবনকে মানিয়ে নেয়া। এজন্য আজ আপনাদের জানাবার চেষ্টা করব কিভাবে লোডশেডিং এর এই সময়টুকু উৎপাদনমুখী বা প্রোডাক্টিভ কাজে ব্যায় করা যায়। আশা করছি উপায়গুলো আপনাদের কাজে আসবে।

বই পড়ুন

ছোটবেলায় আমরা অনেকেই ছিলাম গল্পের বইয়ের পাগল। গল্পের বই পেলে আমাদের আর কিছু লাগত না। তবে বড় হবার সাথে সাথে নানা কারণে এই গল্পের বইয়ের থেকে আজ আমরা অনেকটাই দূরে সরে গেছি। এই লোডশেডিং এ আপনার সেই পুরনো নেশা ফিরিয়ে আনুন। নিজের পছন্দের গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ম্যাগাজিন, যা ভালো লাগে সেটাই পড়ুন। এতে করে ক্ষণিকের জন্য হলেও আপনি জীবনের নানা ঝুট ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে কল্পনার জগতে হারিয়ে যেতে পারবেন। তাতে আপনার মস্তিষ্ক বিশ্রাম পাবে এবং আপনি কাজের জন্য নতুন উদ্যম ফিরে পাবেন। সর্বোপরি গল্পের বই আপনার মন ভালো করে দেবে।

ডায়েরী লিখুন

আমাদের মাঝে অনেকেরই ছোটবেলায় ডায়েরী লেখার শখ ছিল। অনেকেই খুব সুন্দর সুন্দর ডায়েরী কিনে সেখানে নিজের দিনলিপি অথবা বিশেষ কোন ঘটনার কথা লিখে রাখতেন। এখন সেই পুরনো অভ্যেসটাই আবার ফিরিয়ে আনতে পারেন। এতে আপনার মাইন্ড ডাইভার্ট হবে এবং চিত্ত উৎফুল্ল হবে।

বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করুন

লোডশেডিং এর সময়টা এরচেয়ে ভালোভাবে বোধ করি আর কোন কাজেই ব্যায় করা সম্ভব না। আপনার বাসার উঠান, বারান্দা, ছাদ, মোট কথা যেখানেই জায়গা থাকুক সেখানেই কোন না কোন ফুল, ফল, সবজি, বা বৃক্ষ জাতীয় গাছ লাগান। এতে করে পরিবেশের যেমন উপকার হবে, তেমনি আপনার শরীর-মনও ভালো থাকবে। তবে দাঁড়ান, গাছ লাগাবার কথা শুনে আগেই খরচের ভয় পাবার দরকার নেই। আপনার কাছে যদি গাছ লাগাবার জন্য কোনকিছু নাও থাকে, আপনি খুব অল্প খরচেই সেগুলো জোগাড় করতে পারবেন। ইচ্ছা থাকলে আসলে সবই সম্ভব।

শখের কাজ করুন

আপনার যদি কোন শখ থেকে থাকে তাহলে সেই শখের কাজটুকু এই লোডশেডিং এর টাইমে সেরে নিতে পারেন। যেমন অনেকে ছবি আঁকতে পছন্দ করেন, আবার অনেকে ঘর সাজাবার উপকরণ বানাতে পছন্দ করেন। কিন্তু সারাদিনের কাজের ব্যাস্ততায় এগুলোর দিকে মনোযোগ দেবার সুযোগ হয়ে ওঠে না। লোডশেডিং এর সময়টা যেহেতু অন্য কোন কাজে ব্যায় করা সম্ভব হচ্ছে না, তাই এই সময়টুকু নিজের শখের পিছনে দিন।

ব্যায়াম করুন

বর্তমান সময়ে আমাদের সবচেয়ে অবহেলিত সম্পদ হচ্ছে আমাদের শরীর। এই শরীরকে সুস্থ্য রাখার জন্য যে কসরতটুকু করতে হয় তার কিছুই আমরা করি না। কারণ ইলেক্ট্রিসিটি থাকা অবস্থায় যখনই আমরা একটু সময় পাই তখনই ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি বা ইন্টারনেটের জগতে হারিয়ে যাই। লোডশেডিং যেহেতু আমাদের ফোন এবং ইন্টারনেটের সাথে আমাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাই এই সময়টায় আমরা ব্যায়াম করে খানিক ঘাম ঝরিয়ে শরীরটাকে চাঙ্গা রাখতে পারি।

অনেকদিন ধরে ফেলে রাখা কোন একটা ঘরের কাজ করুন

আমাদের বাসায় কিছু কিছু কাজ আছে যা দেখতে খুবই ছোট। এই যেমন ধরুন আপনার বাসায় হয়ত কোন এক জায়গায় ছোট্ট একটা সকেট বসাতে হবে। এতো ছোট একটা কাজের জন্য মিস্ত্রি ডাকা যেহেতু অনেক ঝামেলার ও খরচের এবং এই কাজ যেহেতু আপনি নিজেই পারেন, তাই হয়ত আপনি ভেবেছিলেন কোন এক সময় এটা নিজেই করে নেবেন। কিন্তু অফিসের ফাঁকে বা পরিবারকে সময় দিতে গিয়ে ওই ছোট্ট কাজটাই আপনার কোনভাবে করা হয়ে উঠছে না। এই লোডশেডিং এর সময়টাতে আপনি এ ধরণের ঘরের টুকটাক প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে ফেলতে পারেন।

রূপচর্চা করুন

জ্বি। ঠিকই শুনেছেন। আমি রূপচর্চার কথাই বলছি। এই পর্যায়ে এটা পড়তে থাকা সকল বিবাহিত পুরুষই আমার উপর বিরক্ত হবেন এই ভেবে যে এমনিতেই রূপচর্চা দেখতে দেখতে অবস্থা কাহিল, তারপরও কেন আমি এ ধরণের বুদ্ধি দিচ্ছি। আসলে সত্যি বলতে নারীদের রূপচর্চারও প্রয়োজন রয়েছে। কেন, সে বিষয়ে নাহয় বিস্তারিত আরেকদিন আলাপ করা যাবে। তো যা বলছিলাম, কর্মজীবী নারীরা এই লোডশেডিং এর সময়টাতে মুখে ফেসপ্যাক লাগানো, ব্লিচ করা, ম্যানিকিওর-পেডিকিওর ইত্যাদি কাজগুলো সেরে নিতে পারেন। এতে আপনার প্রয়োজনীয় সময়ের অপচয়ও হবে না, আবার আপনার ত্বকও থাকবে সুস্থ্য এবং উজ্জ্বল।

পৃথিবীতে প্রতিটা জিনিসেরই ভাল-মন্দ দুটি দিকই আছে। আমরা যদি শুধুমাত্র মন্দের দিকেই তাকাই তাহলে জীবন খুব দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তাই লোডশেডিং এর প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিরক্ত না হয়ে বরং সময়টাকে প্রোডাক্টিভ কাজে লাগাবার চেষ্টা করুন। দেখবেন আপনার ভালো লাগবে। আপনার কাছে লোডশেডিং এর সময় করার মতো কাজের কোন নতুন আইডিয়া থাকলে সেটাও আমাদের জানাতে পারেন। এতক্ষণ ধৈর্য ধরে পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আরও পড়ুনঃ

Default user image

শফিকুল বাশার কাজল, লেখক, আস্থা লাইফ

পিতামহ-পিতামহী অনেক শখ করিয়া নাম রাখিয়াছিলেন শফিকুল বাশার কাজল। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক সম্পন্ন করিবার পর খানিক এই কাজ, কতক ওই কাজ করিয়া অবশেষে ২০১৩ সালের শেষ হইতে ‘সামাজিক মতে বেকারত্ব’ অর্থাৎ কিনা লেখালেখিকেই জীবিকা অর্জনের একমাত্র উপায় হিসাবে বরণ করিয়া লইয়াছি। অদ্যাবধি অন্ততপক্ষে আট-দশখানা দিশী-বিদিশী কোম্পানি এবং অগণিত ব্যক্তিবিশেষের জন্যে প্রায় চল্লিশ সহস্রাধিক লেখা নামে-বেনামে সম্পন্ন করিবার সুযোগ হইয়াছে। ভালোবাসি নিজের পরিবার, সন্তান, এবং ফুটবল।

Related Articles