পৃথিবী পাল্টে দেয়া কিছু মরণঘাতী রোগ! ৩য় পর্ব- কলেরা, অ্যানথ্রাক্স, পীত জ্বর, ডেঙ্গু, এবং প্লেগ
ভাইরাস নামের এমন অদেখা জীবের সুত্রপাত কিন্তু আমাদের জন্য নতুন নয়, ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে ৩০০০ বছর আগেও ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপ ছিল, সেসব রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারাও যেত। আমাদের দেশে আগে কলেরার মহামারীতে অনেক মানুষ মারা গিয়েছে। এছাড়াও আমাদের ইতিহাসে বলা আছে যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া সহ আরও কত মাহামারীর নাম যারা এইসব অণুজীবের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই ধারাবাহিকভাবে সেইসব কিছু মহামারী বলব। ধারাবাহিক ভাবে আজ ৩য় পর্বে থাকছে কলেরা, অ্যানথ্রাক্স, পীত জ্বর, ডেঙ্গু, এবং প্লেগ নিয়ে আলোচনা।
মহামারী এবং সংক্রামক রোগ নিয়ে প্রথম পর্বে আমরা জেনেছিলাম গুটি বসন্ত, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, জিকা ভাইরাস এবং হামের ভয়াবহতা। যেখানে আমরা দেখেছি গুটিবসন্তের মতো সংক্রামক রোগ চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও এটা আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে কারণ এর ভাইরাস এখনো সংরক্ষিত। এছাড়াও ছিলো সামান্য মশার কামড় কীভাবে জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ করাতে পারে।
আমরা আরও জেনেছিলাম স্প্যানিশ ফ্লু সম্পর্কে, মহামারী এবং সংক্রামক রোগ নিয়ে দ্বিতীয় পর্বে। যেখানে এই স্প্যানিশ ফ্লু এর ভয়াবহতা যথাযথভাবে তুলে ধরেছিলাম। তাই আজকে কলেরা, অ্যানথ্রাক্স, পীত জ্বর, ডেঙ্গু, এবং প্লেগ নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরব।
কলেরা
“হাজার বছর ধরে” উপন্যাসের ওলা বিবির কথা আমরা প্রায় সবাই জানি। কুসংস্কারে পরিপূর্ণ সেসময়ের এই “ওলাবিবি” হলো আজকের কলেরা। কলেরার মহামারি শুরু হয় মূলত ১৮০০ সালের শুরুর দিকে এবং এর প্রথম মহামারী শুরু হয়েছে এই বাংলায়। তখন একে ডাকা হতো “ওলা বিবি” নামে এবং বলা হতো ওলা বিবি যেই গ্রাম দিয়ে যায় সেই গ্রামকে নিঃস্ব করে দিয়ে যায়। এর একমাত্র কারণ হলো এই রোগ নিয়ে সেসময়ের অজ্ঞতা।
কলেরা মূলত একটি পানিবাহিত রোগ, অর্থাৎ পানির মাধ্যমে এটি ছড়ায়। সেইসব অঞ্চলে কলেরা বেশী হয় যেখানে পানের উপযোগী পানি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুযোগ সুবিধা নেই। এই রোগের পেছনে দায়ী “ভিবরিও কলেরা” (Vibrio Cholerae) নামের ব্যাকটেরিয়া যারা পানি এবং খাবারকে দূষিত করে আক্রান্ত ব্যাক্তির মলের মাধ্যমে। অর্থাৎ প্রতিবার মলত্যাগ করার পর এবং খাবার আগে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত না ধৌত করাও কলেরার অন্যতম একটি কারণ। কলেরা এতোটাই ভয়ানক যে, এর চিকিৎসা যদি ভালোভাবে না করা হয় তাহলে আক্রান্ত ব্যাক্তি পানি শুন্যাতায় ভুগে মারা যেতে পারে।
এখন যদিও কলেরার ভয়াবহতা অতটা চোখে পড়ে না তবুও একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লক্ষ থেকে ৪০ লক্ষ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষানুযায়ী প্রতি বছর ২১০০০ থেকে ১৪৩০০০ লোক মারা যাচ্ছে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে।
কলেরার সূচনা কাল থেকে এখন পর্যন্ত কলেরার ৭ বার মহামারীতে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। উনিশ শতকে এর ভয়াবহতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল, একমাত্র রাশিয়ায়, ১৮৪৭-১৮৫১ সালের মধ্যে ১০ লক্ষেরও বেশি লোক এই রোগে মারা গিয়েছিল। ১৯০০ এবং ১৯২০ সালের মহামারীতে ৮০ লক্ষের মতো মানুষ মারা গিয়েছিলো ভারতে। এছাড়াও এর ভয়াবহতার কবলে পড়েছে চীন, ইন্দোনেশিয়া সহ এশিয়ার অনেক দেশ। ইয়েমেনে ২০১৭ সালে এই কলেরার কারণে মাত্র এক সপ্তাহে ১১৫ জনের মৃত্যু হয়। কলেরার সর্বশেষ মহামারী দেখা গিয়েছিলো ২০১০ সালে, ভয়াবহ এক ভুমিকম্পের পর হাইতি তে কলেরায় প্রায় আট লক্ষের বেশী মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল এবং সেই মহামারীতে ৯০০০ মানুষ মারা গিয়েছিলো।
দূষিত খাবার ও পানি খাবার পর ১২ ঘন্টা থেকে ৫ দিনের মধ্যে কলেরার উপসর্গ ফুটে উঠে এবং প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত এই ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত ব্যাক্তির মলের মাধ্যমে বের হয়। আক্রান্ত ব্যাক্তি মল ত্যাগের পর ভালোভাবে হাত না ধৌত করলে অথবা যেখানে সেখানে মলত্যাগ করলে পরবর্তীতে আরো মানুষ তার দ্বারা আক্রান্ত হয়। এর প্রধান উপসর্গগুলি হল, ঘন ঘন পাতলা পায়খানা, বমি বমি ভাব, পাতলা পায়খানার সাথে পানি বের হয়ে যাওয়ায় শরীরে পানি শূন্যতা দেখা দিবে, প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানগুলোর পরিমাণ কমে যাবে, পেশীতে ব্যাথা করবে এবং ধীরে ধীরে রোগী ক্লান্ত হয়ে পড়বে।
কলেরার একমাত্র চিকিৎসা হল হারিয়ে যাওয়া তরল এবং খনিজ পুনরায় শরীরে ফিরিয়ে আনা। পানি ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম হল খাবার স্যালাইন। তাছাড়া জিংক সাপ্লিমেন্ট নেয়া যেতে পারে, এতে করে খনিজের ঘাটতি পূরণ হবে। এখন আমাদের কাছে কলেরার টীকাও চলে এসেছে যা অনেক কার্যকর।
অ্যানথ্রাক্স
যদিও অ্যানথ্রাক্স প্রাচীন একটি রোগ কিন্ত আমরা অ্যানথ্রাক্স এর সাথে পরিচিত ২০০১ সাল থেকে যখন এটির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ জন আক্রান্ত হয়েছিলো এবং ৫ জন মারা গিয়েছিলো। ধারণা করা হয়েছিলো এটি ছিল একটি অনুজীব অস্ত্র অর্থাৎ কেউ ইচ্ছে করে এই জীবাণু ওই এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছিলো। আমাদের দেশেও অ্যানথ্রাক্স এর প্রকোপ প্রতি বছরই লক্ষ্য করা যায়, প্রতি বছরই মানুষ মারা যাচ্ছে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে যাদের বেশিরভাগই কসাই এবং গবাদি পশু পালক।
সাধারণত অ্যানথ্রাক্স এর জন্য দায়ী “বেসিলাস অ্যানথ্রাসিস” (Bacillus anthracis) নামক ব্যাকটেরিয়া যারা সাধারণত গবাদি পশুদের আক্রান্ত করে থাকে এবং পরবর্তীতে পশুর মাধ্যমে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রজাতির ব্যাক্টেরিয়ার একটি বিশেষ চরিত্র আছে। প্রতিকূল পরিবেশে এই জীবাণু স্পোর হিসাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী সুপ্ত অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে এবং প্রায় সব মহাদেশে এই জীবাণু বিদ্যমান এমনকি কুমেরুতেও বেসিলাস ব্যাকটেরিয়ার স্পোর পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। সুপ্ত অবস্থায় থাকার পর এই স্পোর নিঃশ্বাসের সাথে, ত্বকের ক্ষতস্থান দিয়ে অথবা দৈনন্দিন খাবারের মাধ্যমে আমাদের দেহে প্রবেশ করে এবং পুনরায় নিজেকে সক্রিয় করে খুব দ্রুত বংশ বিস্তার করতে থাকে।
মানুষ সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত হয় যখন সে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গবাদি পশুর সান্নিধ্যে থাকে, রক্ত মাংসের সংস্পর্শে আসে এবং সেই গবাদি পশুর গোশত ও দুধ খায়। অ্যানথ্রাক্স এতটাই ভয়ংকর যে এক সমীক্ষায় প্রমাণ মিলেছে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগীদের ৯২ শতাংশই মারা যায়। মানুষ থেকে মানুষে অ্যানথ্রাক্স ছড়ানোর কোনো প্রমাণ মিলেনি কিন্তু তাদের ব্যাবহার করা পোশাক অ্যানথ্রাক্স এর জীবাণু বহন করতে সক্ষম এবং যদি কেউ এর সান্নিধ্যে আসে তাহলে সেও অ্যানথ্রাক্স এ আক্রান্ত হবে।
তাই এর থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের অবশ্যই সাবান দিয়ে গোসল করতে হবে শরীর থেকে জীবাণু দূর করার জন্য, অ্যান্টিব্যকটেরিয়াল সাবান বেশী উপকারী। গোসলের আগে পানি অবশ্যই ব্লিচিং পাউডার অথবা অ্যান্টিসেপ্টিক দিয়ে বিশুদ্ধ করতে হবে। আক্রান্ত ব্যাক্তির পোশাক এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র ৩০ মিনিটের বেশী সময় ধরে গরম পানিতে ফুটাতে হবে অথবা আক্রান্ত ব্যাক্তির ব্যাবহার করা সব কিছু পুড়িয়ে ফেললে সবচেয়ে বেশী ভালো।
১৯৫৪ সালেই অ্যানথ্রাক্স ভ্যাক্সিন প্রথম বাজারে আসে, তাই আমাদের ভয় একটু কম কিন্তু যেকোনো সময় এই রোগ মহামারী নিতে পারে তাই লক্ষণ প্রকাশের সাথে সাথেই আক্রান্ত রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব প্রতিষেধক দিতে হবে এবং মাংস ও দুধ এসব খাওয়ার আগে ভালো করে সিদ্ধ করে খেতে হবে।
মানুষের ক্ষেত্রে তীব্র জ্বর, চামড়ায় ক্ষত, লালচে দাগ, আক্রান্ত স্থানে দেড় থেকে দুই ইঞ্চি পরিমাণে ফোসকা পড়ে যাওয়া এবং মাঝে মাঝে পচনের মতো চামড়ার নিচে কালচে দাগ দেখা যাওয়া হল এই রোগের প্রধান লক্ষণ। গবাদি পশু এই রোগে আক্রান্ত হলে তার শরিরের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে, খিঁচুনি হবে, গায়ের লোম খারা হয়ে যাবে, শ্বাসকষ্ট দেখা দিবে এবং ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পশুটি ২৪ ঘন্টার ভেতর মারা যাবে।
ডেংগু
ডেংগু জ্বরকে ব্রেক বোন জ্বরও বলা হয়ে থাকে, এটি ছড়ায় এডিস মশার মাধ্যমে। এই জাতীয় মশা এই রোগের জীবাণু “ডিইএনভি ভাইরাস” বহন করে থাকে এবং পরবর্তীতে ভাইরাস বহনকারী মশার কামড়ে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সিডিসি এর সমীক্ষায় পাওয়া যায় প্রতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। প্রায় ৮০০ বছর আগে এই রোগের দেখা পাই আমরা, তখন বানর থেকে এই ভাইরাস প্রথম মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে এই রোগ আফ্রিকাতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে সংক্রমিত হতে থাকে ভারতীয় উপমহাদেশে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতে, দক্ষিণ চীনে এবং তাইওয়ানে। আর এখন প্রায় প্রতিবছরই এই রোগ মহামারী ধারণ করছে এর অন্যতম কারণ হল আমাদের অসচেতনতা এবং এর নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক না থাকা।
গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে আমাদের দেশে ডেঙ্গুর মহামারীতে প্রায় এক লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। আমাদের দেশের এর প্রথম প্রকোপ দেখা যায় ২০০০ সালে তখন মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় শত ছুঁয়ে ফেলেছিলো, তারপর ২০১৫ সালের পর প্রকোপ বাড়তে থাকে এবং এখন প্রায় প্রতি বছরই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের থেকে আরো ৪ গুন বৃদ্ধি পাবে তাই আমাদের হতে হবে আরো সচেতন।
যখন ভাইরাস বহনকারী এডিস মশা কোনো সুস্থ মানুষকে কামড়ায় তখন সেই ভাইরাস দ্বারা মানুষটি সংক্রমিত হয় আবার যখন কোনো ভাইরাস বহন করে না এমন মশা ঐ ব্যাক্তিকে কামড়ায় তখন সেই মশাটিও ডেঙ্গুর বাহক হয়ে যায় আর এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে ডেঙ্গু। ডিইএনভি ভাইরাসের ৪ টি প্রজাতি আছে, তাই যাদের ধারণা যে ব্যাক্তি একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে সে আর আক্রান্ত হবে না তাদের জন্য দুঃখের সংবাদ হলো আক্রান্ত ব্যাক্তি সুস্থ হলেও বাকি ৩ প্রজাতির ভাইরাসের মাধ্যমে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে, তাই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত আমাদের সবাইকে কারণ প্রথম সংক্রমণ থেকে দ্বিতীয় সংক্রমণ আরো তীব্র ও মারাত্মক হয়ে থাকে।
এক গবেষনায় দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিয়ে জীবনযাপন করছে কারণ তারা এমন স্থানে বাস করে যেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা কিন্তু আমরাই ঘরে লালন পালন করছি। কারন এটি জন্ম নেয় বাড়ির বাইরে বা ভেতরে থাকা জমা পানিতে। হতে পারে সেটা ফুলের টবে অথবা গাড়ির টায়ারে অথবা পরিত্যাক্ত কোনো হাড়িতে, এমনকি ফ্রিজ ও এসি এর জমা পানিতেও এডিস মশা প্রজনন করে থাকে। এই মশা ভোরবেলায় এবং বিকেল বেলায় খুব সক্রিয় থাকে তাই দিনের বেলাতেও আমাদের মশারী ব্যাবহার করা উচিত।
ডেংগু জ্বরের লক্ষণ প্রকাশ পেতে সাধারণত ৩-৪ দিন সময় লাগে এবং এই জ্বর ১০ দিন অথবা তার বেশী দিন স্থায়ী হয়। এই জ্বরে কেউ আক্রান্ত হলে সাধারণ ফ্লু এর লক্ষণগুলি বেশী দেখা দেয় কিন্তু এই ভাইরাস একটি মানুষকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে যদি শুরু থেকে চিকিৎসা না দেওয়া হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ডেঙ্গু জ্বর যখন বিপদজনক আকার ধারণ করে তখন রোগীর হঠাত উচ্চ জ্বর আসা, মাথা ব্যাথা করা, পেশীতে ব্যাথা করা, প্রচন্ড দুর্বলতা, বমি হওয়া, ডায়রিয়া, রক্ত বমি অথবা প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়ার ফলে রক্ত শুন্যতা দেখা যাওয়া এবং নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া এসব লক্ষণ প্রকাশ পায়। ডেঙ্গুর কারণে রক্তচাপ অত্যাধিক কমে যেতে পারে, যার ফলে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। ডেংগু ছোঁয়াচে নয়, এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে না, এটি শুধু মাত্র এডিস মশার কামড়েই হয়ে থাকে। তাই মশার জন্মস্থানকে ধ্বংস করতে হবে, কোনোভাবেই পানি জমতে দেওয়া যাবে কোথাও, পরিষ্কার পরিছন্ন রাখতে হবে বাড়ির চারপাশ।
ডেঙ্গু নিয়ে আরও জানতে হলে এই লেখাটি পড়তে পারেন, যেখানে অনেক বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
পীত জ্বর ( ইয়োলো ফিভার )
ডেঙ্গু জ্বরের মতো পীতজ্বর বা ইয়োলো ফিভারও মশাবাহিত একটি ভাইরাল জ্বর। পীত জ্বরের ভাইরাসও ডেঙ্গুজরের ভাইরাসের মত “ফ্ল্যাভিভাইরাস” গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং এটি এডিস প্রজাতির মশার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে থাকে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগীর চামড়া এবং চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যায় তাই একে ইয়োলো ফিভার বলা হয়ে থাকে। এছারাও অন্যান্য লক্ষণ গুলো মধ্যে আছে, জ্বর, মাথা ব্যাথা, গাঁটের ব্যাথা, পেশীতে ব্যাথা এবং বমি হওয়া। এগুলো সব প্রাথমিক পর্যায়ের উপসর্গ।
সাধারণত বেশীরভাগ রোগীই প্রাথমিক পর্যায়ের পর সুস্থ হয়ে উঠেন কিন্তু সুস্থ হয়ে ওঠার ২৪ ঘন্টার মধ্যে আবারও একই উপসর্গ ফুটে উঠার প্রমাণ মিলেছে তখন এটাকে বলা হয় স্টেজ ২। স্টেজ ৩ অথবা তৃতীয় ধাপে এসে রোগীর লিভার, হার্ট ও কিডনীতে সমস্যা দেখা দেয়। চোখ, মুখ ও মলের সাথে রক্তপাত হয় এবং ধীরে ধীরে রোগী কোমায় চলে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে পীত জ্বরে আক্রান্ত রোগী তৃতীয় ধাপে প্রবেশ করলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশী। সাধারণত সংক্রমিত হওয়ার ৩-৬ দিন পরে রোগীর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের উপসর্গ দেখা দেয় এবং তখন সঠিক চিকিৎসা করলে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠে।
পীতজ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর প্রায় ২৫-৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং আক্রান্ত হয় প্রায় ২ লক্ষ মানুষ যার ৯০ শতাংশ রোগীই আফ্রিকার। এই রোগ আমাদের এশিয়াতে তেমন একটা চোখে না পড়লেও আফ্রিকা এবং দক্ষিন আমেরিকার প্রায় ৪৭টি দেশে এই রোগের প্রকোপ অনেক বেশী। জলবায়ু পরিবর্তন, লোকজনের ভ্রমণের আধিক্য, শহরমূখী হওয়ার প্রবণতা এসব কারণে ১৯৮০ সাল থেকে পীতজ্বরের রোগী বেড়ে চলেছে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই রোগ আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং উনবিংশ শতাব্দীতে এসে পীতজ্বরকে অন্যতম ভয়ানক সংক্রামক ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই আমাদেরও সচেতন হতে হবে কারণ যেকোনো সময় এশিয়াতেও আসতে পারে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস।
প্লেগ
যদিও প্লেগ এখন দেখা যায় না কিন্তু এই প্রাচীন ঘাতক এখনও আমাদের সাথে রয়েছে এবং যে কোন সময় হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক। এটি একটি ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ এবং এর জন্য দায়ী “ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস” (Yersinia pestis) নামের ব্যাকটেরিয়া যারা পরজীবী আকারে বন্য ইদুর অথবা মাছির মধ্যে থাকে। প্লেগ এতটাই ভয়ানক যে পৃথিবীতে মহামারি আকারে এই প্লেগ বেশ কয়েকবার নিজের ভয়ংকর রূপ দেখিয়েছিল, তাই মহামারির কথা এলেই সবার আগে আসবে প্লেগ এর ভয়াবহতা।
রোমান সম্রাজ্যে প্রথম প্লেগ এর ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়, তৎকালীন রোমান সম্রাট জাস্টিয়ান আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে একে তখন জাস্টিয়ান প্লেগ বলা হতো। এই এক মহামারিতে সেসময় প্রায় ৩ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। প্লেগের ২য় মহামারি দেখা দেয় ১৩৪৭ সালের দিকে এবং এর ভয়াবহতা এতো বেশী ছিলো যে ইতিহাসে একে “ব্ল্যাক ডেথ” নামে অভিহিত করা হয়। এর নাম ছিলো বিউবনিক প্লেগ, যা মাছির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং এতে প্রায় তখনকার এক তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে প্লেগের তৃতীয় মহামারী দেখা দেয়, ১৮৯৪ সালে প্রায় ৬ মাস স্থায়ী হওয়া এই মহামারিতে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় শুধু মাত্র চীনের ক্যান্টন শহরেই। এরপর আরো বহুবার প্লেগ তার দেখা দিয়েছে, ১৯০৪ , ১৯০৭, এবং ১৯২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্লেগ এর সর্বশেষ মহামারি দেখা দিয়েছিলো এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত এই মহামারি স্থায়ী ছিলো। যদিও আমাদের দেশে এই রোগ এখনও দেখা যায়নি কিন্তু ১৯৯৪ সালেও ভারতে দুইবার প্লেগের আক্রমনে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছিলো। বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা জানিয়েছে, প্লেগের মৃত্যুর হার প্রায় ৬০ শতাংশ এবং এর জীবাণু এখনও বন্য ইঁদুরের মধ্যমে বিদ্যমান যেখানে এটি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে তাই যেকোনো সময় এই প্লেগের মহামারি আবার দেখা দিতে পারে।
চলবে...
